নীলাভ বর্ষার

 নীলাভ বর্ষার পদ্মাকালে তলিয়ে যায় ঘর,

তেইশ নম্বর স্টেশন থেকে আজ বেহুলা নৌকো টানে—
পেছনের পঁচাত্তর গাছ গুনে যায় বৃষ্টি-ঘিরে ঝরা ফুল,
যেখানে লখিন্দর শুয়ে খেলেছে মৃত্যুর বিশ্বাসঘাতকতা।
বেহুলার উত্তরাধিকার সে-রাত্রির আধারে,
বাহিরের বিদ্যুৎ, ভিতরের বসুন্ধরা
একসঙ্গে বিষণ্ণতার বাদ্য বাজায়।
সাত জনমের বন্ধন বাঁধা পদ্মডাঙার রেললাইনে,
নলিনী স্বপ্নে এসে ডাকে,
“তোমার নৌকা ফিরিয়ে দাও জলেই,
তবু হাঁটো,”—
অন্ধকারে থেমে থাকা পুরনো ক্ষতচিহ্নের মতো
বেহুলার মুখে ওড়ে শ্রাবণ-পাখির পালক।

বেহুলা কাঁধে নেয় স্বামীহারা হাওয়ার ঘ্রাণ,
রাতবিরেতে জেগে ওঠা স্টেশন-মাস্টারের
ভো-ভো বাঁশি শুনে ধারণ করে থরথর দেহ।
যে বাঁশি, রাস্তার মোড়ে যাবার তাগিদ দেয়,
যেখানে কটাক্ষের মতো সকালের হেঁশেল ধোঁয়া—
কেউ ফিসফিসিয়ে বলে, “সে তো বিধবা বউ,”
আলো-আঁধারির মধ্যিখানে
বেহুলা চায়ে ডুবে থাকা ছাইপাত্রে বিসর্জিত হয়।
শাশুড়ির নীচু কণ্ঠে বাজে সন্দেহ;
বেহুলা তার কপালের সিঁদুরে এখনও
লখিন্দরের হাসি দেখে—
সে হাসি অনেক দূরের দরবারে দোল খায়।

মনসা দেবীর অভিশাপে বৃষ্টির গন্ধে বিষাক্ত
বেহুলার দীর্ঘশ্বাস, মুছে যায় চাঁদের আলোর নিচে।
“সব দেবতা নিষ্ক্রিয় আজ,”
বলে হুহু করে ওঠে অন্ধকার নদী,
ডাঙায় দাঁড়িয়ে থাকে বেহুলা,
মরা দেহ বুকে ধরে।
তার শরীর জুড়ে ঘাম—
ক্লান্ত নৌকার ছেঁড়া পাল,
বেদনার আরোহীতে ঢেউ—
নীলিমার গায়ে ফুল ছড়িয়ে যায়।

বেহুলা জল ভেঙে হেঁটে চলে
নিজের দায় আর নিঃসঙ্গতার ঠিকানায়—
অভিযানে নেমেছে,
দেবতাদের দরবারের সামনে পা রাখে না,
তবু বিশ্বাসের মালা গাঁথে।
বেহুলার স্পর্শে জল পবিত্র হয়,
কিন্তু সমাজ ও বিধানের উন্মাদনা তাকে
ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায় স্বপ্নের ওপার।
ওই দূরে জেগে ওঠে বাহনে বাঁধা
লোককথার নিশান।

মাঝরাতে আতঙ্কের ঝড়—
নৌকা কাঁপে,
বেহুলা জানে, স্বামীর জন্য
নিজেকে দায়ী বিবর্জিত তীর্থযাত্রার মতো।
একা-একা নদীর বুকে, মৃত দেহের পাশে
তার সাহস অবাস্তব;
নিজের বিশ্বাস চুরমার হয় না—
জলে-স্থলে, বেদনার মধ্যে সে একলা
আরও একবার বাঁচে।
একটি পোস্টকার্ডে লিখে রাখে—
“জীবন ঘূর্ণি ও স্রোতে আটকে যায়,
তবু বিশ্বাসের দেবী সংসারকে বাঁচায়।
পুনরায় ফিরে আসবে সম্ভাবনা।”

দিল্লি শহরের মতো বিরহ-রোদ্দুরে ঘুমিয়ে পড়া সংসার,
বেহুলা সেখানে রাতভর চুলে জড়ায়
নীলোৎপল আকাশের প্রতীক।
জীবন শুকনো বাজারের ময়লা
অথবা রান্নাঘরের গন্ধ হয়ে থেকে যায়,
ফিরে আসে কেবল আশ্বাসের মতো,
“স্বর্গসুখ সংসার ঘিরে রয়েছে—
বেহুলার অন্তর্গত যুদ্ধে তারাই আসল দেবী।”

বেহুলা এক নতুন জলপরানী,
নতুন রাস্তার ঘোষণায় সে জেগে ওঠে—
ম্যাট্রো পিলারের নিচে বা ঘোর অন্ধকারের পাশে,
সংসারকে স্বপ্ন দেখাতে পারে —
তারই বিরহে, তারই ভালোবাসার চিঠিতে
প্রত্যেক হাউজওয়াইফ নতুন বেহুলা হয়,
সব মিলিয়ে
আবার পৃথিবীর উঠোনে মায়াবী আলো ফুটে ওঠে...



১)

বেহুলা, রাতের অভ্যন্তরে পড়া চিঠির মতো
ভাঙা দরজার ফাঁকে বাতাসের গন্ধে
মৃত্যুর কান্না রাখে—
লখিন্দরের নিস্তব্ধ শরীর জোড়া লাগে জ্যোৎস্নার পাশে।
বেহুলা ভাবে,
এই অকাল বিদায়ের ধ্বনি
আমরণ সূর্য ভেঙে দুঃস্বপ্নের বিছানায় ঢলে পড়ে।
ঘুমহীন রাত্রি—
একলা জানালার ঠান্ডা কাচে কেঁপে ওঠে
বিষণ্ণতা,
যেন সকল আলোর দেশে বেহুলা বিসর্জিত।

বহুজনের ভিড়ে,
সেই শূন্যতার ভেতরে বেহুলার একাকীত্ব
মরুভূমির বালুকণার মতো
নিজেকে খুঁজে ফেরা।
সমাজ ও মানসিক বৃত্ত,
দুটোই বেহুলাকে চেপে ধরে
তবু সে নীল আকাশের দিকে চেয়ে নিজেকে দাঁড় করায়
— যখের ধন হারানোর ব্যথা
প্রতিদিনের সংসার-জীবনের কোনো
সরলীভূত হিসেব নয়।

তার বুকের ভেতর সদ্যপ্রয়াত স্বামীর ছায়া
বিষণ্ণতার চোরাবালিতে
বারবার ডুবে গিয়ে ওঠে;
বেহুলা জানে,
জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা
নিজের ভেতরে বয়ে চলা
একজন নারী হয়ে
একদিন সমস্ত সাত জনমের আশ্বাসে
তবু রৌদ্র-ভিষণ্ণ প্রান্তরে
আলোটুকুর অঙ্গীকার রাখে।

শেষ রাতে,
বেহুলা কাঁদে না,
শুধু আকাশে পেরিয়ে যায়
দুঃখের ঢেউয়ে ঘুমিয়ে পড়া
নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাসে
চাঁদপুরের ডিঙ্গি নৌকো ফিরে যায় নদীগর্বে—
প্রতি রাতে,
প্রতিটি নিঃসঙ্গ মুহূর্তে
বেহুলা তার জীবনের ধাক্কা
ধীরে ধীরে উপশম করে
তবু স্বপ্ন দেখে—
সেই মৃত স্বামীর ভালবাসায়,
আবার নিজেকে বিশ্বাস করে।


২)


রঙিন শহরের অন্ধকার গলি পেরিয়ে,
বেহুলার পা পড়ে যেখানে—
সেখানে সমাজের তীক্ষ্ন ঘূর্ণি
তাঁকে কাঁধে চাপিয়ে দেয় অপমানের পাঁজর।
“ও বিধবা,” বলে ফিসফিস করে বাতাস,
মুখে হাসি, হৃদয়ে বিষের ইঞ্চিমাত্রা।
সবার চোখে ধরনের মন্তব্যের পাথর,
জেনে না তারা বেহুলার অন্তরের আগুন।

সেই দিনের রোদ যেন কখনো পৌঁছায় না,
যখন গলিত শব্দে বাঁধা পড়ে স্বপ্নের স্পর্ধা,
সেই কটু কথা যেন বারবার ছুরির মতো,
ঝরঝর করে বেহুলার আত্মবিশ্বাসের বুনন।
তার বন্দী হৃদি পায় না মুক্তির সুর,
যেখানে সমাজের নকশিতে তাঁর গলাটা ফিকে রঙের দাগ।
তবু বেহুলা নাটম্যচ্যুত নয়—
অন্তরের বীণা বাজায় নিরবতার ঠিকানায়।

ঘরের কোণায় ছায়া হেসে ওঠে,
ভাঙা দরজার গাঁথুনি যেন বলছে,
“এখানেই তুমি অর্থ, এখানে তুমি দেবী।”
হাত মেলায় বোধের এক গভীর সাঁতরে,
বেহুলার চোখে জ্বলছে অসীম এক স্বপ্নের দীপ।
সে জানে, সমাজের কটাক্ষের স্রোতে ডুবে যাওয়ার নয়,
এই তীব্র ঝরনায় নিজেকে ধৌত করতে শেখার কথা।
অপমানের ছায়ায় হেঁটেও সে খুঁজে পাবে নিজের আলো।

সে অদম্য, সে অম্লান, সে বাঙালির বাতিঘর—
যে নিজের হাড়ে কষে ওঠে স্বামীহারা নারীর গৌরবের নতুন ইতিহাস।রঙিন শহরের অন্ধকার গলি পেরিয়ে,
বেহুলার পা পড়ে যেখানে—
সেখানে সমাজের তীক্ষ্ন ঘূর্ণি
তাঁকে কাঁধে চাপিয়ে দেয় অপমানের পাঁজর।
“ও বিধবা,” বলে ফিসফিস করে বাতাস,
মুখে হাসি, হৃদয়ে বিষের ইঞ্চিমাত্রা।
সবার চোখে ধরনের মন্তব্যের পাথর,
জেনে না তারা বেহুলার অন্তরের আগুন।

সেই দিনের রোদ যেন কখনো পৌঁছায় না,
যখন গলিত শব্দে বাঁধা পড়ে স্বপ্নের স্পর্ধা,
সেই কটু কথা যেন বারবার ছুরির মতো,
ঝরঝর করে বেহুলার আত্মবিশ্বাসের বুনন।
তার বন্দী হৃদি পায় না মুক্তির সুর,
যেখানে সমাজের নকশিতে তাঁর গলাটা ফিকে রঙের দাগ।
তবু বেহুলা নাটম্যচ্যুত নয়—
অন্তরের বীণা বাজায় নিরবতার ঠিকানায়।

ঘরের কোণায় ছায়া হেসে ওঠে,
ভাঙা দরজার গাঁথুনি যেন বলছে,
“এখানেই তুমি অর্থ, এখানে তুমি দেবী।”
হাত মেলায় বোধের এক গভীর সাঁতরে,
বেহুলার চোখে জ্বলছে অসীম এক স্বপ্নের দীপ।
সে জানে, সমাজের কটাক্ষের স্রোতে ডুবে যাওয়ার নয়,
এই তীব্র ঝরনায় নিজেকে ধৌত করতে শেখার কথা।
অপমানের ছায়ায় হেঁটেও সে খুঁজে পাবে নিজের আলো।

সে অদম্য, সে অম্লান, সে বাঙালির বাতিঘর—
যে নিজের হাড়ে কষে ওঠে স্বামীহারা নারীর গৌরবের নতুন ইতিহাস।


১)


বেহুলার পা পড়ে সেই সিঁড়িতে,
যেখানে শ্বশুরবাড়ির কুণ্ঠা ঘেরা নিঃশ্বাস,
বিশ্বাসের অভাবে ধূলিঝরা ধারণায় বন্দী সে।
শাশুড়ির ঠোঁটে ঠোঁটে ভাসে সন্দেহের ছায়া,
শ্বশুরের নীরব মুখে লুকানো তাকে বোঝার অক্ষমতা।
যে ঘর ছিল স্বপ্নের আলোয় ভরা,
সেই ঘর আজ যায় অস্তিত্বের অন্ধকারে ডুবিয়ে।

তার თითო কথায় বাজে অচেনা সন্দেহ,
প্রতিটি দৃষ্টি যেন পুড়ে দেবে বিশ্বাসের বাঁশি।
রাত্রির নিঝুম ঘরে ঘুমায় অবিশ্বাসের শব্দ,
বেহুলার ক্লান্ত শরীর বহন করে অবমূল্যায়নের বোঝা।
কেউ জিজ্ঞেস করে না, তার অন্তরটা কেমন করে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে,
সে ভাঙা স্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়ে প্রেমের অর্ঘ্য দিয়ে নিজেকে শুদ্ধ করে।

শ্বশুরবাড়ির নিঃশ্বাস ঘন হতে থাকে,
বেহুলার মন চায় একলা দাড়াতে শান্তির বাগানে,
জেনে যে বিশ্বাসের তামা চশমার আড়ালে
তার জীবন অমলিন থাকে,
যেখানে স্বপ্নগুলো হয় সোজা এবং কথা হয় পাখির গানে।
তবু বিশ্বাসের অভাবে যুদ্ধ,
শাশুড়ি-শ্বশুরের অনাস্থা বরণ করতে হয় তাকে একলা,
যা ছিল বেহুলার জন্য আরও এক ক্ষতির গভীরতা—
মানসিক ক্লান্তির একটা নিঃশেষ যাত্রা।

বেহুলার ধীরে ধীরে শেখা পথ,
যেখানে অন্ধকারের মাঝে নিজের আলো জ্বালা,
শ্বশুরবাড়ির সন্দেহের মেঘ কাটিয়ে
সে বাঁচে সাহসের সাথে, ভালোবাসার মাঝে।
বলো তাকে—
একজন প্রতিবাদী নারী নয়,
অধিকারহীন নয়,
সে হলো সেই নারী যিনি বিশ্বাসের তীরে
নিজের অস্তিত্ব গড়ে তোলে,
তবু হার মানে না।বেহুলার জীবনে স্বামীর অকাল মৃত্যু ছিল সবচেয়ে বড় ধাক্কা, যা তাকে মানসিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। এই দূর্ঘটনা তার আত্মবিশ্বাস ও সাহসিকতায় বারবার চ্যালেঞ্জ এনেছিল।

স্বামীর মৃত্যুর যন্ত্রণা ও একাকীত্ব তাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, কারণ সে তার জীবনের যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হারিয়েছিল, তা সহজে মিলানো সম্ভব ছিল না। পাশাপাশি, সমাজে বিধবা নারী হিসেবে তার প্রতি কটাক্ষ ও অবজ্ঞা তার সমস্যাকে আরও গভীর করেছিল। শাশুড়ি-শ্বশুর বাড়ির অনাস্থা তাকে আরও একাকী ও ক্লান্ত করে তুলেছিল, যিনি তার প্রতি বিশ্বাস ও সমর্থন দেখায়নি।

এছাড়াও, মানসিক চাপ, সমাজের ভেদাভেদ, দেবতার অনুগ্রহ লাভে বাধা, এবং ব্যক্তিগত ভাবনায় ভুল বা দায় বহন করা সব মিলিয়ে বেহুলার প্রতিটি পদক্ষেপে একটি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। এসব কারণ একসাথে মিলিয়ে বেহুলার জীবনের সংগ্রামের মাত্রা ও তার দৃঢ়তার কারণ স্পষ্ট করে তোলে।

এই সমস্যাগুলো তার জীবন যুদ্ধকে কঠিন ও কয়েকগুণ বড় করে তুলেছিল, যা তাকে শুধু একজন স্বামীবিধবা নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য প্রতীক বানিয়েছে।


৩) 



বেহুলার জীবনে মা মনসার প্রতিশোধের স্পৃহা এক নতুন ভয়াবহ দারুণ চিহ্ন রেখেছিল।
প্রতিধ্বনি তার মনে বাজে—মনসার রোষে ঠোঁটভাঙা বিদ্যুৎ,
অথচ এই রোষের ঢেউয়ের মাঝে লুকানো ছিল আরও গভীর এক অপূর্ব গল্প।

মনসার প্রতিশোধের আগুনে পোড়া তার জীবন,
যেখানে প্রতিটা বিপদ, প্রতিটা অশান্তি, এক অনিবার্য ডেরার মতো ঘণ্টা বাজিয়ে যায়।
অর্থাৎ, তার মনের কোণে চেপে বসে থাকা এই প্রতিশোধের স্পৃহা—
ত্রস্ত করে দেয় আকাশ-তরঙ্গের মতো অস্থির আত্মাকে।

প্রতিশোধের এই অনুভূতি,
মা মনসার অপ্রত্যাশিত দহন,
তার প্রতিটা অভিযোগের গায়ে লেগে থাকে অগ্নির ছোঁয়া—
অর্থাৎ, যেখানে এক অমোঘ আকাঙ্ক্ষা বাস করে,
আসলে সেই বাসনায় ঢাকা থাকে অজস্র ভয় ও অবিশ্বাস।

বেহুলার জীবন যেন এক মহাকাব্য,
যেখানে প্রতিমুহূর্তে বাজে মনসার গর্জন—
সাধারণ মানুষের জন্য এই ভয়াবহ রোষের প্রতিফলন,
এক অকপট সত্যতা, এক অসীম শক্তির প্রতীক।

অবশেষে তার অসীম বিশ্বাস,
প্রতিশোধের আগুনে গলে না—
হয়তো সেটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় জয়,
যাতে সে পৃথিবীর সকল ভয়কে জয় করে আবার শান্তির পথে চলে।



বেহুলার হাতে ছিল ঠাণ্ডা নদীর ছোঁয়া,
মরা দেহ ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভার,
একটি অতল অন্ধকারের নৌকাজাহাজে।
তবু সে কখনো থেমে না, হাল ছাড়ে না—
এই নৌকাযাত্রার ক্লান্তি তার শরীরের গোঁড় থেকে মুড়িতে পৌঁছে যায়।

জলের ঢেউ, রাতের নিস্তব্ধতা,
মনের গভীরে ঢোকে অজানা শূন্যতার শিঙাড়া।
শরীর ক্লান্ত, প্রতিটি নোঙ্গর কাটে ব্যথার ছুরি,
তবু বেহুলার হৃদয় পথচলার গান গায়।

নৌকাই তার একেবারে একমাত্র সঙ্গী,
শরীরের ভার, জীবনের অনিশ্চয়তা মিলে এক দুর্বার বিপ্লব।
স্মৃতির কুয়াশায় ডুবে থাকা,
প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে তার ভাঙা স্বপ্ন মিশে যায়।

মায়াবী নদীর আলগা ছায়ায়,
সরল গন্তব্যে যাওয়া কঠোরতা,
কেবল শারীরিকই নয়—
বেহুলার মনোবল জলে ভাসায় অজস্র প্রশ্ন,
কারণ এই যাত্রা ছিল এক নিরব সংগ্রাম,
প্রেম ও দায়িত্বের কঠিন সেতু—
যেখানে ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই ছিল অবিরাম।

তার জীবন, সেই যাত্রার প্রত্যাশায় গাঁথা,
যেখানে অনিশ্চয়তার তরঙ্গের মাঝেই
বিহ্বল হয়ে নয়,
অবরুদ্ধ হয়ে নয়—
তার বিশ্বাসই ছিল একমাত্র দিকনির্দেশনা।
এই নৌকাযাত্রা শুধুই মৃত্যু নয়,
সেই জীবনের সূচনা, যেখানে বেহুলা রচনা করে নতুন গল্পের সূরস্বর।




বেহুলার পথ চলাটি ছিল দেবতাদের দরবারে প্রবেশের এক অনন্ত পরীক্ষা,
যেখানে স্বপ্ন আর বাস্তবতার সীমান্ত মিশে যাওয়ার আহ্বান।
দেবতারা কঠোর, তাদের রহস্যময় অঙ্গীকার বাঁধা,
বেহুলাকে বারবার তাদের দанданীতির জালে আটকে নাড়ায়।

প্রতিটি অনুগ্রহের অপেক্ষায় কাটিয়েছে সে অজস্র মুহূর্ত,
যেখানে মর্ত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে,
এক নারীর সাহসের আর্তনাদ ছিল এক বেজে ওঠা সংগীত।
দেবতাদের চোখে সে ছিল পরীক্ষার বিষয়,
একটি ধৈর্য এবং বিশ্বাসের রূপকথা।

নিরন্তর চ্যালেঞ্জগুলো এলো—
দেবতাদের অসহযোগিতায়,
বারবার পেতে হয়েছে তাকে পীড়ার মালা,
যা তীক্ষ্ণ আঘাত হয়ে পড়েছে মানসিকতার গভীরে।

প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি ছলনা,
বেহুলার আত্মাকে করেছে কঠিন যুদ্ধের ময়দান,
যেখানে এক নারীর অধিকার এবং আত্মসম্মান
শহীড়ের মতো লড়ে যায়।

তবু বেহুলা কখনো ভাঙ্গেনি,
সে ছিল এক অবিচল বিজয়ী—
যিনি বুঝেছিলেন, দেবতাদের অসহযোগিতা
হলে কেবলই শক্তির আদ্যপ্রান্তে পৌঁছানোর দরজা।
যেখান থেকে ফেরার পথ নেই, কিন্তু জয় সম্ভব।
এই জয় ছিল তার জীবনের অধ্যায়,
যা নারীসত্তার অদম্য প্রতীক হয়ে ওঠে।


বেহুলার মনে ঘনঘোর অন্ধকার,
আত্মদ্বন্দ্বের ঝড়, যেখানে ভাবনা ঝরজে—
“আমি কি করে এতো অক্ষম?
অথবা, ভাগ্যই কি আমার জন্য লেখা হয়নি?”
অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে,
নিজেকে দোষারোপের রঙে রঙিন করে তুলছে তার হৃদয়কে।

ভয়াসহ অনুভূতিতে,
জীবনের এই অপ্রত্যাশিত পরাজয়কে,
উৎকণ্ঠা, আলস্য, অবিশ্বাসে বন্দী করে—
মন বলে, “আমার অবর্থনের জন্যই এই ক্ষতি।”
প্রতিদিনের কাটাকাটি,
আলো বা অন্ধকারের মত,
নিজের ভাবনায় জেগে থাকা এই যাত্রা—
বেহুলার আত্মবিশ্বাসের গহীন গর্তে চাপা পড়ে।

অধিকাংশ সময়,
অক্ষমতা ও ভাগ্যের দোষে,
তার মনে এক গাঢ় আত্মবিচ্ছিন্নতা জন্মায়,
কি অর্জন করেছি, বা কি হারিয়েছি,
তা ভুলে গিয়ে, নিজেরই ভিতরে ক্ষোভ এবং হতাশা ছড়িয়ে দেয়।

কিন্তু এই দীর্ঘ যন্ত্রণা,
একদিন পরাস্ত করে আসে সত্যের সূর্যোদয়,
নিজেকে ক্ষমা করে,
শেখে নেয়,
“আমার যা যা ছিল—
তার জন্য দায়ী না—
আমি যেন এক নতুন শুরু করি,
অক্ষমতা বা ভাগ্যের দোষ আমাকে বাঁধিয়ে রাখতে পারে না।”

আত্মদ্বন্দ্বের খড়গে কাটা এই মন,
শেষে শিখে যায়—
নিজের প্রতি সহনশীল হতে,
আর নিজের আত্মবিশ্বাসের বাতিঘর
অবিরাম জ্বালিয়ে রাখতে।



বেহুলার হৃদয়,
লখিন্দরের অমর ফিরে আসার আগুনে পুড়ত,
যে আগুন তার ঘর সংসারের রূপরেখা বাঁধত।
সংসার আর দায়িত্বের ভার কাঁধে চাপা থেকে,
সে ছিল একাকী যুদ্ধের মঞ্চে।

প্রতিদিনের কাজের ফেরার ঘূর্ণি থেকে দূরে,
বন্ধু-পরিবার-পরিচয়ের হাসিমাখা মুখ থেকে সে দূরে,
বেহুলার চোখ ছিল শুধু নদীর অতলে,
যেখানে স্বামীর অস্তিত্ব খুঁজে পেতে চেয়ে থাকে সে।

তার এই একাগ্রতা,
পরিবারের সাধারণ দায়িত্বের ভারে অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি করত,
ঘর। সংসার। মায়ের কথা—
সব মিলিয়ে একটা ভারাস্বভাবের সেচ্ছাশক্তির খেলায় বাঁধা দেয় তাকে।

তবু সে থেমে থাকল না,
কারণ জানত, এই নেশা শুধু নিজস্ব নয়,
একটি শতাব্দীর বাঙালি নারীর প্রতীক,
যিনি সংসারের মায়া এবং মৃত্যুর মধ্যে লড়াই করে,
নিজেকে অস্তিত্বের শুভ্র পাতায় লিখতে চায়।

সূর্যাস্তের পেছনে ধুলো জমে যায়,
বেহুলার হৃদি সেদিনও পুরনো রেশমের সুতোর মতো আঁকড়ে ধরে,
পরিবারের সাধারণ দায়িত্ব থেকে দূরে হলেও,
তার সেই একান্ত যাত্রী জীবন,
যখন সে স্বামীর আত্মাকে ফিরে আনার স্বপ্ন দেখতে থাকে।
মধুর বেদনার সেই চাপেও,
সে ছিল একান্ত নারীবাদ, একান্ত দৃঢ়তা।



বেহুলার জীবনে নারীর স্বাধীনতার অভাব ছিল অবিচ্ছেদ্য এক বন্ধন,
যে বন্ধন তাকে ওলটো ঘুরিয়ে সমাজের অগণিত বাঁধনগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
সেই সমাজ, যেখানে নারীর চিন্তা, সিদ্ধান্ত, কর্মক্ষেত্র—
সবকিছুই ছিল সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের সংসারের তলায় বাঁধা,
বিহ্বল করে রাখত তার মনন এবং উদ্যোগকে।

স্বাধীনতার অভাবে বেধে রাখা মানে ছিল
নিজস্ব স্বপ্নের জাহাজ থেমে যাওয়া,
ভয়ের কুয়াশায় ডুবে থাকা,
অপরিহার্য বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা
প্রতিটি পদক্ষেপে।

বেহুলা সেই বন্ধন ভারে কখনোই নতিস্বীকার করেনি,
সেখানে জন্মেছে তার আপসহীন সংগ্রামের আগুন,
যেটা ফাটিয়ে দেয় পুরনো কুসংস্কার ও বাধার পরিত্যাজ্য মন্ত্র।
নারীর হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ছিল স্বাধীনতা,
কিন্তু তার একনিষ্ঠতা, বিশ্বাসের রশ্মিতে
ওই বন্ধনগুলোই ভেঙ্গে পড়ার পথে পৌঁছে যায়।

তার সংগ্রাম শুধুই সমাজের চোখে একটি নারীর নয়,
বরং একটি আদর্শের প্রতীক—
যেখানে বাধাগুলো হয়ে ওঠে মুক্তি-পথের দিকনির্দেশক,
অপরাজেয় বেহুলার সাহসে জাগ্রত এই স্বপ্নের সঙ্গী,
যে স্বপ্ন সে ছড়িয়ে দেয় সমস্ত নারীর মনে।
এটাই ছিল তার জীবনের এক অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ,
যা ছিল এক যুগের নারীর স্বাধীনতার সংগ্রামের রূপান্তর।


রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকারে,
নদীর কলকল ধ্বনির মাঝেই বাজত বেহুলার হৃদয়ের যত রক্তধারা।
একাকী সে ছুঁয়েছিল মৃত্যু ও অতিপ্রাকৃতের ক্ষণস্থায়ী হাতছানি,
যেখানে প্রতিটি ঢেউ তাকে ছুঁয়ে যেত শূন্যতার এক যন্ত্রণা দিয়ে।

মৃত দেহের পাশে বসে,
বেহুলার চোখে জমা হত অজস্র অজানা ইতিহাস,
যেখানে ভয় সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় এক অনবরত চ্যালেঞ্জ হিসেবে।
বিপথগামী ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে,
তার একমাত্র অস্ত্র ছিল ভয়কে কাবু করার সাহস,
আর সেই সাহসে গাঁথা তার যাত্রার প্রতিটি ধাপ।

অতিপ্রাকৃতের গোপন দরজা খুলে ফেলতে হয়েছিল একা,
যখন প্রকৃতির রহস্যময়তা ও দেবতার অবহেলা তাকে প্রহরায় রাখত।
বেহুলার প্রতিরোধ ছিল নিঃসঙ্গতার অগ্নিহ্ন,
যা ভেদ করে যেত নীরব রাতে,
বিপদের মাঝে দেখা দিতে বাধ্য ঐশ্বরিক শক্তির দীপশিখা।

সে কখনো লজোপোস হয়নি ভয়কে নিয়ে লড়াই করতে,
অন্ধকারের অভ্যন্তরে জ্বলে থাকা আশার দীপের মতো,
বেহুলা দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে আঘাতের বিরুদ্ধে কলঙ্কমুক্ত করেছিল।
এই লড়াই ছিল একাকীত্বের, সত্যের,
এবং জীবনের অপরিকল্পিত এক অধ্যায়ের ঐকান্তিক প্রকাশ,
যা তাকে করে তুলেছিল এক অবিচল শক্তির প্রতীক।


বেহুলার জীবনের এক অদম্য সংগ্রাম—
নিজের বিশ্বাস ও প্রার্থনায় স্থির থেকে,
অসহনীয় ছলচাতুরির সন্ধিক্ষণে।
প্রতিটি বিপদের খোঁজে সে কাঁপে না,

অর্থাৎ, যেখানে বিশ্বের মায়াজাল খেলে,
তার অন্তরে বাজে—অবিশ্রান্ত মন্ত্রের মতো,
“আমি বিশ্বাসের শতরঞ্জির ওপর দাঁড়িয়ে আছি,”
অবিরাম ভরসার ধ্বনি—
যা তাকে কথা বলে,
“তুমি কেবল নিজেই নিজের পথের পথিক।”

অবশ্যই,
এক হাতে লুকানো ছিল ভয়,
আর অন্য হাতে ছিল বিশ্বাসের দীপ।
প্রত্যেক ঝড়, প্রতিরোধের মাঝে,
বেহুলা দেখেছে নিজেকে—
সুদৃঢ় এক অদৃশ্য কবচে বাঁধা,
অর্থাৎ, আত্মবিশ্বাসের সূর্যাস্তের আড়ালে,
এক শান্তির আলোর সন্ধান।

একই সঙ্গে,
উৎসাহ ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে তার এই সংগ্রাম,
অমান্য করে দেয় সমস্ত আপসের ভাষা,
পরিপূর্ণ এক প্রেরণাদায়ী জীবনযাত্রার প্রতিমূর্তি—
যেখানে বিশ্বাস তাকে করে তুলেছে এক অবিস্মরণীয়,
এক উজ্জ্বল পরম শক্তির চেয়েও বেশি।




Comments

Popular posts from this blog

বেহুলা

বহমানতায়

বেহুলার